ওয়েবারের “পৌর” শিল্পনীতি / Weber’s Theory

ছেলেবেলায় ভূগোল বইতে পড়েছিলাম ওয়েবারের শিল্পনীতি। সেই তত্ত্বের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল, পরিবহন ব্যয়, মজুরি ব্যয় ও শিল্পের কেন্দ্রীভবনের সুযোগ সুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে সর্বনিম্ন ব্যয় এলাকা সন্ধান করা, যা শিল্পকেন্দ্রের মুনাফাকে সর্বাধিকরনে সাহায্য করে। তখন শুধু মুখস্থ করেছিলাম। বুঝিনি। কারণ, ছেলেবেলায় শিল্প মানে বড় বড় কারখানার চেয়ে বেশি কিছু বুঝতাম না। আর যখন একটু বড় হয়ে দেখলাম, ডিনামাইট দিয়ে প্রায় তৈরি কারখানা উড়িয়ে দেওয়া হল, তখন থেকেই শিল্পের প্রতি কেমন একটা যেন অনীহা তৈরি হয়েছিল। এখন আর এট্টু বড় হয়েছি, তাই ভাবলাম, আবার পড়ে দেখি, ওয়েবারের শিল্পনীতিটা ঠিক কি! বিশেষ বুঝতে পারিনি পড়ে, আর বুঝবই বা কি করে? এই রাজ্যে তো আর শিল্প আসে না, আর যে কয়টা ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোতেই ইয়া বড় বড় তালা ঝুলছে এখন। কিন্তু, উদ্দেশ্য যখন মহৎ, তখন কোনো বাধাই বাধা নয়। এই ভাবতে ভাবতেই চলে এলো পুরভোট, সারাদিন কখনো মোবাইল, কখনো টিভিতে মুখ গুঁজে, জলের মত করে বুঝে গেলাম শিল্পনীতি, একেবারে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়নের কায়দায়।

কিভাবে? বলি তাহলে। আগেই বলেছি, এই তত্ত্বের উদ্দেশ্য হল, পরিবহন ব্যয়, মজুরি ব্যয় ও শিল্পের কেন্দ্রীভবনের সুযোগ সুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে সর্বনিম্ন ব্যয় এলাকা সন্ধান করা, যা শিল্পকেন্দ্রের মুনাফাকে সর্বাধিকরনে সাহায্য করে। শেষ থেকে শুরু করি তবে।

১) শিল্পকেন্দ্রের মুনাফাকে সর্বাধিকরন

নির্বাচন প্রক্রিয়ায় “মুনাফা” অর্জনকে আমরা এক কথায় বলতে পারি, ভোটে বিজয়ী হওয়া। যতবার জয়, ততবার মুনাফা আয়ের সুযোগ। হার মানে ঝাঁপ বন্ধ। মুনাফার আপাতত ইতি।

২) সর্বনিম্ন ব্যয় এলাকা সন্ধান:

এই সময় মার্কেটে কর্মসংস্থানের যা অবস্থা, সর্বনিম্ন ব্যয় এলাকা সন্ধান করা, এমন কিছু কঠিন কাজ না। যেখানে সাধারণ মানুষের দৈনিক আয় খুব কম, সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল তোলা উচিৎ। এতে ইনভেস্টরের অনেকটাই ইনভেস্টমেন্ট কমে। তেমনই একটা এলাকার নাম নতুনগ্রাম। আর এই পঞ্চায়েত অঞ্চল কৃষ্ণনগর পৌরসভার এক্কেবারেই কাছে। এখানেই সস্তায় এক দিনের কাজের মানুষ পাওয়া যায়। কিন্তু তারা কতটা সুলভ! সেটা আসছে পরের পয়েন্টে।

৩) পরিবহন ব্যায়, মজুরি ব্যয় ও শিল্পের কেন্দ্রীভবন

এটা তিনটি পয়েন্ট খুব ভাইটাল। মন দিয়ে পড়বেন আর রেফারেন্সের জন্যে ভিডিও ফুটেজ দেখবেন। ভিডিওতে যে একদিনের কাজের মানুষ, কাছের মানুষকে দেখতে পাবেন, তিনি নিজেই বলছেন, ছাপ্পার কাঁচামাল হিসেবে তার মত ২০ জনের জন্য পরিবহণমাধ্যম হিসেবে টোটোই যথেষ্ট। তার মানে অত্যন্ত সুলভ পরিবহণ।

এবার মজুরি। ভিডিওর ভদ্রলোকের দৈনিক মজুরি মাত্র ২০০ টাকা, মানে জলের দর বলা চলে। তবে যদি আপনি চোখ কান খোলা রাখেন, তাহলে আরো কমেও পেতে পারেন। কিন্তু এক্সপিরিয়েন্সড রিসোর্স নিতে গেলে, বাজেট আরো একটু বাড়তে পারে।

আর শিল্পের কেন্দ্রীভবন! বলার দরকার হবে কি আর! সবাই জানি, ভোটের দিন সব কিছুরই কেন্দ্রীভবন হয় এলাকার বুথগুলোতে, সিম্পল। এক্ষেত্রেও কেন্দ্রীভবন ঘটেছিল কৃষ্ণনগর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে।

এবার স্ট্র্যাটেজি

গোটা ২০ সুলভ শ্রমিক জোগাড় করুন, সবাইকে ২০০ টাকা করে দিন। আপনার খরচ আসবে ৪,০০০ টাকা। আর আপনার ওয়ার্ড যদি ছোটো হয়, ধরুন হাজার চারেক লোকের হয়, আর মেরে কেটে পাঁচটা বুথ হয়, তাহলে কেল্লা ফতে। এরা সব বুথে গোটা বিশেক করে ফলস ভোট এমনি এমনি দিয়ে দেবে।

তার মানে ৫ বুথে, ২০ টা রিসোর্স ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলবে। গুণ করলে টোটাল হবে ১০০ রিসোর্স। এবার প্রত্যেকে ২০ টা করে ফলস ভোট দিলে, এমনিই আপনি ২,০০০ ভোট পেয়ে যাবেন। আর আপনি নিজের ভোট তো দেবেন! ব্যাস, হয়ে গেল ২,০০১। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা।

তারপর কি, পাঁচ বছর পায়ের উপর পা তুলে বসে যান, কলকাতার বাবুদের মত অ্যাস্টন মার্টিন না হলেও একটা মারুতি গাড়ি নিতেই পারবেন। ওয়ান টাইম ইনভেস্টমেন্ট মাত্র ৪,০০০ টাকা। এতে শিল্পও হল, আপনি জনপ্রতিনিধিও (বা দলপ্রতিনিধি) হলেন, সাথে ২০ টা মানুষের একদিনের জন্যে কর্মসংস্থানও (পড়ুন উন্নয়ন) হল। হল আরও কত কিছু, সব বললাম না, কারণ আপনি সব জানেন।

অনেক ডিটেইলস দিলাম। এত কিছু জানার পরেও যদি পরের বারে এইটুকু টাকা ইনভেস্ট না করতে পারেন, তাহলে আর ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ভাববেন না।

ধন্যবাদান্তে,
রাইজ অফ ভয়েসেস