ধাঁধার থেকেও জটিল তুমি / The Puzzle

পৃথিবীর অন্যতম পুরোনো খেলাটায় শব্দই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। যা ধারালো এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে সক্ষম। খেলাটার নাম রাজনীতি।

রাজনীতিবিদরা এটা বেশ ভালো করেই জানেন, বোঝেন যে প্রতিটি বাছাই করা বাক্য দিয়ে কিভাবে শক্তি প্রয়োগ করা যায়। শব্দ কিভাবে আপনাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এবং বহু সমস্যার নিরাময় করতে পারে। কিন্তু একই সাথে এই শব্দই উস্কানি দিতে পারে, বিভাজন করতে পারে এবং কোনো কিছুকে ধ্বংস করতে পারে।

একবার ভাবুন। একটি উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা যেভাবে একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, আবার একটি ঘৃণ্য কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য মানুষে মানুষে সহিংসতা উস্কে দিতে পারে। তাই যেকোন রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের এই ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের সাথে যে দায়িত্ব আসে, তা অপরিসীম। তবুও, রাজনীতির কারবারিদের দ্বারা বারেবারে উপেক্ষা করা হয় দায়িত্বকে, স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক লাভের আশায় বিসর্জন দেওয়া হয় মানুষের প্রতি দায়বোধ।

এটা কেবল “আপনার” বিরোধীদের সাথে দ্বিমত পোষণ করার বিষয় নয়। এটি আপনার বিরোধীদের “রাক্ষস” বানানোর বিষয়, শত্রুতে পরিণত করার বিষয়। যেকোন ধরনের ঘৃণা ভাষণের উদ্দেশ্য মানুষের ভয় এবং ক্রোধকে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো। লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে জয়লাভ করা, যা আমরা বর্তমানে ডান থেকে বাম সর্বত্র দেখতে পাই। যা পেতে, রাজনীতিবিদরা বারে বারে অযৌক্তিক দাবি করে যান, ভুল তথ্য ছড়িয়ে যান। নিজেদের স্বার্থে বিভেদের আগুনে ঘি ঢালেন। এটাই হলো রাজনৈতিক বক্তৃতার বিপজ্জনক খেলা। আর সংবাদমাধ্যমের দৌলতে আমরা সবাই এই ক্রসফায়ারে আটকা পড়েছি।

মনে আছে, এক সময় যখন একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেশের কোন এক বিশেষ শ্রেণীর নাগরিকদের “গাদ্দার” বলে গুলি করার স্লোগান শাউট করেছিলেন? কখনো কোন বড় নেতা পোশাক দেখে মানুষ চিনেছেন? কখনো ঘরে ছেলে ঢোকানোর কথা বলেছেন, কখনো গায়ের রং কালো বলে কাউকে উপেক্ষা করেছেন অথবা যখন অন্য বড় রাজনীতিবিদ তাদের বিরোধীদের জনগণের শত্রু বলে আখ্যা দিয়ে গর্জন করে বিসর্জনের ডাক দিয়েছিলেন? এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো হল পরিকল্পিত কৌশল। যা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার জন্য তৈরি, সমর্থকদের উত্তেজিত করার জন্য তৈরি, আসল সমস্যা থেকে মনোযোগ ভোলানোর জন্য তৈরি, আর সবচেয়ে বড় কথা হৈ হৈ করে এগুলো কাজ করে। তারপরে এই বিবৃতিগুলি সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে জনমানসে আধিপত্য বিস্তার করে, তারপরে ঢুকে পড়ে আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথনে।

কিন্তু এর বিনিময়ে আমরা কী হারাই? নেতারা যখন এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেন, তখন তাদের কর্মী থেকে পেটোয়া মিডিয়া এই নেতা-নেত্রীদের মুখ নিঃসৃত বানীকে মানুষের কাছে স্বাভাবিক করে তোলেন, গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। কারণ শব্দের ক্ষমতা আছে। আমাদের ধারণাকে রূপ দেওয়ার ক্ষমতা, আমাদের বিশ্বাসকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা, আমাদেরকে ভবিষ্যতের দিকে পরিচালিত করার ক্ষমতা।

আর যখন সেই শব্দগুলোই ঘৃণা এবং বিভেদে পূর্ণ থাকে, তখন এর পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে, কারণ তখন শব্দের আর মমতা থাকে না।

করো প্রতি আস্থার ক্ষয় সম্ভবত সবচেয়ে ক্ষতিকারক পরিণতি। আমরা যখন ক্রমাগত বিভেদমূলক বক্তৃতা দ্বারা বোমাবর্ষিত হই, তখন আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো সেটা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর, কখনো আমাদের গণমাধ্যমের উপর, এমনকি একে অপরের উপর। আর ক্রমাগত বাড়তে থাকা অবিশ্বাস মেরুকরণের জন্য উর্বর জমি তৈরি করে।আড়াআড়ি ভাবে ভেঙে পড়ে সমাজ, সভ্যতা। ফলস্বরূপ আমরা নিজেদেরকে এমন লোকেদের সাথে ঘিরে রাখি যারা ইতিমধ্যেই আমাদের সাথে একমত। যেখানে দ্বিমত হওয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে, আপস করা বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হয়। আর ধীরে ধীরে আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করে।

কিন্তু এটা শুধু রাজনীতির বিষয় নয়।এই বিষাক্ত বক্তৃতা সময়ের সাথে পা মিলিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে পড়ে, কুসংস্কার এবং বৈষম্যকে উৎসাহিত করে, ইন্ধন দেয়। যা আমাদের আরও আরও সন্দেহপ্রবণ করে তোলে। মানুষকে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে বিচার করাতে শেখায়।

দেখুন, একে অপরের সাথে দ্বিমত পোষণ করা ঠিক আছে। এটা স্বাস্থ্যকর। এটি একটি কার্যকর গণতন্ত্রের ভিত্তি। কিন্তু শ্রদ্ধাশীল বিতর্ক এবং প্রকাশ্য শত্রুতার মধ্যে পার্থক্য আছে। ভাবনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ব্যক্তিদের খারাপ বানানোর মধ্যেও অনেক অনেক ডিফারেন্স থাকে। আমাদের নেতাদের কাছ থেকে আরও ভাল কিছু দাবি করা উচিত। তাই তাদের তাদের কথার ব্যবহারের জন্য জবাবদিহি করা প্রয়োজন।

বিভেদমূলক বক্তৃতা কে বলছেন বা কারা ছড়াচ্ছেন তা প্রতিহত করার প্রয়োজন প্রত্যেকেরই থাকা দরকার, সাথে রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের ছুড়ে দেওয়া তথ্যের বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

আমরা যা পড়ি এবং শুনি তা নিয়ে প্রশ্ন করি। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসন্ধান করি। যারা ভিন্ন মত পোষণ করেন তাদের সাথে শ্রদ্ধাশীল সংলাপে জড়িত হই। হাল ছেড়ে দিয়ে হতাশ বোধ করা, হতাশার কাছে নতি স্বীকার করা সহজ। কিন্তু আমরা হতাশাদের জিততে দিতে পারি না। কারণ আশায় কেবল চাষা বাঁচে না, গোটা সমাজ বেঁচে থাকে। আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ একে অপরের সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। নির্ভর করে সাধারণ ভিত্তি খুঁজে বের করার উপর, আরও ন্যায়সঙ্গত এবং ব্যালান্সড সমাজ গড়ে তোলার উপর। এর অর্থ এই নয় যে ভিন্নমত দমন করা হচ্ছে।

এ হলো আলোচনার স্তর উন্নত করার বিষয়, বিভেদ এবং ঘৃণার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়। অনুপ্রাণিত করার, ঐক্যবদ্ধ করার এবং নিরাময় করার জন্য শব্দের শক্তিকে পুনরুদ্ধার করার বিষয়। আর এটি অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। কিন্তু আমরা যদি একটি উন্নত ভবিষ্যত চাই, তাহলে এই চ্যালেঞ্জ আমাদের একসাথে মোকাবেলা করতেই হবে।

করবেন?

ধন্যবাদান্তে
রাইজ অফ ভয়েসেস