পিসি, ভাইপো, আইপ্যাক ও ইডি / Special Four!!!

কয়লা পাচার কান্ডে ভোট কুশলী সংস্থা ‘I-PAC’ এর কর্ণধারের বাড়িতে ও অফিসে ইডির তল্লাশি এবং সেই সময় মাননীয়ার সেখানে হানা দিয়ে ফাইল দস্তাবেজ বগলদাবা করে বেরিয়ে চলে যাওয়া…. কি থ্রিলিং ব্যাপার না!

কিন্তু আমাদের এতটা থ্রিলড হয়ে পড়াও উচিৎ না যাতে আমরা জরুরি প্রশ্নগুলো করতে ভুলে যাই….

এক, ভোট লড়ে দল, সরকার নয়! তাহলে ‘ভোটকুশলী’ সংস্থার অফিসে ইডি হানা দেওয়ায় সরকারের মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ কমিশনার সহ সিনিয়র পুলিশ আধিকারিকদের সাথে নিয়ে সেখানে ‘ফাইল’ উদ্ধার করতে হাজির হলেন কেন? কোন অধিকারে বা পদাধিকার বলে?

দুই, ভোট কুশলী সংস্থার অফিসে কয়লা পাচার দুর্নীতির ‘আঁচ’ লাগলো কি করে? তাহলে কি ভোট কুশলী সংস্থা গুলো চলে এই কয়লা চুরির টাকায়? প্রশ্নটা উঠছেই।

তিন, সাধারণতঃ ইডি-সিবিআই যখন রেড করে বা তল্লাশি চালায় তখন সেখানে বাইরের কেউ ঢুকতে তো পারেই না, আর সেখান থেকে ফাইল দস্তাবেজ নিয়ে বেরিয়া যাওয়া তো দূর অস্ত! তাহলে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো কি করে? মুখ্যমন্ত্রী ‘ফাইল’ হস্তগত করলেন কিভাবে? এটা কি ইডি আধিকারিকদের অপদার্থতা নয়? এর দায় কি কেন্দ্রীয় সরকার তথা মোদী-শাহেরা নেবেন?

চার, প্রথমটায় কিছু সূত্র থেকে মিনিমিন করে বলা হচ্ছিল বা দাবি করা হচ্ছিল শুধু কিছু ‘সরকারি’ ফাইল নেওয়া হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন একটি বেসরকারি ভোট কুশলী সংস্থার অফিসে সরকারি ফাইল গেল কি করে?

পাঁচ, একদল বঙ্গ সংবাদমাধ্যম সকালের দিকে এটাও বলবার চেষ্টা করছিল দিল্লির এক পুরানো মামলার সূত্রে ইডির এই অভিযান। পরে জানা গেলো, না, তা মোটেই নয়। কয়লা পাচার কান্ডের সূত্রে চলছে তল্লাশি। তাহলে প্রথমটায় মিডিয়ার একটি অংশের কেন এই লুকোছোপা?

ছয়, কয়লা পাচারকান্ডে ভাইপোর নাম আছে তা মোটামুটি সবাই জানে। তাহলে এক্ষেত্রে অকুস্থলে কে গেছিলেন…রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নাকি ভাইপোর পিসি ?

সাত, নারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি কান্ডে রাতের অন্ধকারে সল্টলেকের পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের লকার ভেঙে লাল ডাইরি ও পেন ড্রাইভ হাতিয়েছিল রাজ্য পুলিশের ‘সিট’ যা পরবর্তীতে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সিটের নেতৃত্বে ছিলেন রাজীব কুমার। আর আজ সামনে এলো সবুজ ফাইল ও আরও অসংখ্য দলিল দস্তাবেজ যা হাতিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন মাননীয়া পুলিশমন্ত্রী নিজে! তা এরপর কি? ফের কি সেই টানটান ‘গ্রেপ্তার হচ্ছে-হবে’ নাটকটা শুরু হবে? নাকি সত্যিই কাজের কাজ কিছু হবে?

আমাদের রাইজ অফ ভয়েসেসকে জিজ্ঞেস করলে বলবো সে আশা ক্ষীণ। ভোট আসছে, তাই এত দাপাদাপি, ভোট চলে গেলেই আবার যে কে সেই….

গোটাটাই যে ‘প্রি-প্ল্যান্ড’ সাজানো নাটক এবং আমাদেরকে বুদ্ধু বানানোর এই সাজানো নাটকে দিদি ও মোদী দুজনেই যে কুশীলব- এই এতটা সত্যি আমরা বুক ঠুকে বলতে চাইছি না। যদিও ইদানীং জনমানসে গতি পেয়ে যাওয়া ‘সেটিং’ তত্ত্বে জল ঢালতেই জনসমক্ষে এটা যে একটা কুটিল নাটক অভিনীত হলো তা নিয়ে আমাদের মনে খুব একটা সন্দেহ নেই। শুধু নাটকের বুনোটটা আর একটু শক্তপোক্ত হলে ভালো হত। কারণ আজকের অভিনীত নাটকটাই ঘুরিয়ে ফের একবার ‘সেটিং’ তত্ত্বে সিলমোহর দিয়ে দিল যেটাকে এখন ভাড়াটে মিডিয়াকে দিয়ে দিদি-মোদির যুদ্ধ হিসেবে দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা হবে। চেষ্টা হবে দিদির একটা বেশ ‘লড়াকু’ ভাবমূর্তি গড়ে তোলার যেটা অধুনা দুর্নীতির পাকেচক্রে ডুবে যেতে বসেছে। হয়তো আমাদের ধারনা এনারা তাতে সফলও হবেন এবং যারফলে বঙ্গবাসীর দুর্দশা আরও দীর্ঘায়িত হবে।

আর তাই সবার ভালোর জন্য এবার একটা জিনিষ আমাদের সবার বোঝবার সময় হয়েছে।

আপনি যতবার ভাববেন বা আপনাকে দিয়ে ভাবানোর চেষ্টা হবে রাজনীতিতে দুর্নীতিটা কোন ইস্যু নয়, ততবার দুর্নীতিগুলোই একটার পর একটা সামনে আসবে। আর সেই দুর্নীতির প্রমাণ লোপাট করতে অভিযুক্তেরা ছুটোছুটি করবে। দুর্নীতি ঢাকতে খেলা হবে সাম্প্রদায়িক তাস, দেওয়া হবে জাতিসত্ত্বা ও ভাষার সুড়সুড়ি। এটাই ‘খেলা হবে’র আসল খেলা।

আপনি যতবার বলবেন ‘বিজেমূল’ বলে কিছু নেই ততবার গরু-ছাগলের মত বিক্রি হয়ে দল অদল-বদল করে মুকুল- অর্জুন- জলশোভনরা বা সেলিব্রিটি বনি-শ্রাবন্তী-পার্নোরা প্রমাণ করে দেবে ‘বিজেমূল’ হলো ঘোর বাস্তব।

আপনি যতবার নিজেকে বোঝাবার চেষ্টা করবেন “সেটিং” বলে কিছু নেই ততবার আপনার সামনে একে একে মদন-কানন-ববি-কেষ্ট-পার্থ-বালু প্রভৃতি দুর্নীতিগ্রস্তরা জামিন পাবে ও আপনার সামনে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে। কয়লা পাচার কান্ডে ভোট কুশলী সংস্থার অফিসে ইডির তল্লাশি চলাকালীন মাননীয়া সদর্পে গিয়ে হাজির হবেন এবং গোছা গোছা ফাইল -দস্তাবেজ নিয়ে বেরিয়ে চলে যাবেন। ‘নটি’ চৌকিদার বাহিনী হাঁদার মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে। আর তারপর তাদের কেশবিহীন বা শ্বেত শ্মশ্রুগুম্ফওলা মাস্টাররা স্টেজ থেকে জঙ্গলরাজ নির্মূল করবার ডাক দেবেন।

আর সবশেষে যতবার বঙ্গ মিডিয়া আপনাকে ভাবানোর চেষ্টা করবে সিপিআই(এম) কোথায়…. ওরা তো শূন্য…. ঠিক ততবার আপনার মনে পড়বে এই সিপিআই(এম)ই বলেছিল দুর্নীতিটা ইস্যু। বিজেমূল আছে। আর ‘সেটিং’টা ঘোর বাস্তব।

এখন প্রশ্ন একটাই….আপনি কি সেই ঘোর বাস্তবের মাটিতে দাঁড়াবেন ? নাকি মিডিয়ার বানানো ‘বাইনারি’ গপ্পে ভেসে গিয়ে বাংলার অস্মিতা, আত্মসম্মান ও ঐতিহ্যকে বিসর্জন দেবেন!

ধন্যবাদান্তে
রাইজ অফ ভয়েসেস

পুনশ্চঃ চোখ বুঝে একবার ভাবুন তো, বিধান রায়, জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরা ইডি-সিবিআই তল্লাশির সময় অকুস্থলে হাজির হয়ে তদন্তে বাধা দিচ্ছেন এবং সেখান থেকে অভিযোগের যাবতীয় ‘ফাইলবন্দি’ তথ্য প্রমাণ বগলদাবা করে বেরিয়ে আসছেন! পারছেন ভাবতে !!!!!