Detect – Despise -Dethrone

নির্বাচন কমিশন এই মুহুর্তে আমাদের রাজ্যে প্রকৃত ভোটার খুঁজছে। বাদ দিতে চাইছে জাল-ভুয়ো এবং মৃত ভোটারদের। মানে খাতায় কলমে ‘এসআইআর’ এর উদ্দেশ্য অন্তত সেটাই। এটা একটা স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং এটা হওয়াও উচিৎ।
কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়াগায়। কেন্দ্রের শাসক দলের নেতারা ‘এসআইআর’ পদ্ধতিতে খুঁজছেন বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা। এনারা নাকি বাজারে রাস্তাঘাটে চারিদিকে বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা দেখতে পাচ্ছেন। তাই চলছে হুমকি -ধমকি ‘ডিটেক্ট-ডিটেইন্ড-ডিপোর্ট’। যদিও আমরা যদ্দুর জানি ভোটার তালিকায় নাম না থাকাটা আদৌ প্রমাণ করে না আপনি এদেশের নাগরিক নন। মানে সব ভোটারকে দেশের নাগরিক হতে হবে এটা ঠিকই, কিন্তু উল্টোটা মানে সব নাগরিকের ভোটার হওয়ার কোন দায় নেই। যারা এটা বুঝতে গিয়ে হোঁচট খেলেন, তাদেরকে আরেকটু সরলীকৃত করে দিই ব্যাপারটা। মানে ধরুন আপনি একজন সেই অংশের নাগরিক যিনি পার্টি-পলিটিক্স বোঝেন না। মানে ঐ অরাজনৈতিক আর কি। কাজেই বাকিদের মত আপনার এত ভোট দিতে যাওয়ার ঝুট-ঝামেলা নেই। আপনি বলতেই পারেন এই যে দলবেঁধে দেশবাসীর একটা বড় অংশ একদল অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত-প্রোপাগান্ডাপ্রেমী-লুম্পেনকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে নেতা-মন্ত্রী বানিয়ে দেশের সর্বনাশ করে ন্যুনতম ‘নাগরিক’ কর্তব্য পালনের নামে বগল বাজান, ভোটের দিন বাঁ হাতের তর্জনীতে ভোটের কালি লাগিয়ে পোজ দিয়ে ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন, আপনি সেরকমটা করতে চান না। কাজেই আপনি খুব সচেতনভাবেই ভোটার কার্ড বানান নি বা বানাচ্ছেন না। আপনি মনে করেন শুধুমুধু আপনার পার্সের মধ্যে একটা ভোটার কার্ড গুঁজে রাখবার কোন মানে নেই। তা সেক্ষেত্রে দেশ কি পারবে আপনাকে ঐ ‘ডিটেক্ট-ডিটেইন্ড-ডিপোর্ট’ করতে ? স্পষ্ট উত্তর হলো না। আর ঠিক এই কারণেই নাগরিকত্ব নির্ধারণটা নির্বাচন কমিশনের কাজের মধ্যে পড়ে না। এটা দেশের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কাজ। কিন্তু তাতে কি ? সাম্প্রতিক অতীতে বঙ্গ রাজনীতি শেষ কবে যুক্তি-তর্কের ধার ধেরেছে! আর ভোটার নির্ধারনের সাথে এভাবে খানিকটা অযাচিতভাবেই নাগরিকত্ব ইস্যুটা জুড়ে যাওয়ায় রাজ্য জুড়ে ছড়িয়েছে আতঙ্ক।
নাহ, এ আতঙ্ক আর শুধু এরাজ্যে লুকিয়ে থাকা বাংলাদেশী-রোহিঙ্গাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, আঁচ পড়েছে মতুয়াভূম ঠাকুরনগর-গাইঘাটা-বনগাঁ-বিরাটি সহ মতুয়া অধ্যুষিত এলাকা গুলোতে। এনাদের সামনে নাগরিকত্বের গাজরটা খুড়োর কলের মত ঝোলানো আছে বিগত প্রায় ৬-৭ বছর ধরে, কিন্তু কিছুতেই বাগে আসছে না। পাশাপাশি আতঙ্ক ছড়িয়েছে সেইসব উলুখাগরা আন্ডার প্রিভিলেজড মানুষের (ঘটনাচক্রে এরাই আমাদের দেশে ও রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ) মধ্যে যাঁদের ভাত-কাপড়েরই ঠিক থাকে না, সেখানে নাগরিকত্ব ‘থুড়ি’ ভোটার তালিকায় নাম তোলবার কাগজপত্র এনাদের ঠিকঠাক থাকবে এমনটা আশা করাটাও নিতান্তই বাতুলতা । এরা আমাদের দেশের সেইসব হতভাগ্য মানুষজন যাঁরা ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাদের নিজেদের বা বাপ-মায়ের সামান্য নামের বানান ভুল থাকবার কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন! কারণ এনারা জানেন না বানান ঠিক করতে গেলে ঠিক কি কি করতে হবে! ফলে এই বহুবিধ আতঙ্কের পরিবেশে ঘটছে কিছু আত্মহত্যার ঘটনা।
আর রাজ্যের শাসক খুঁজছে ঠিক এই মৃতদেহগুলোই। যদি কিছু করে তালে-গোলে ‘এসআইআর’ এর কারণে মৃত্যু বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় এবং এসআইআর বন্ধ করে দিয়ে জাল-ভুয়ো ও মৃত ভোটারদের নামগুলো ভোটার তালিকায় রেখে দেওয়া যায়। কারণ এই ভোটগুলোই ভোটের দিন শাসকদলের কেষ্টবিষ্টুরা দুপুরের পর বুথ পাহারায় থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদেরকে ঘুস-ঘাস দিয়ে হাতকরে, সিসিটিভি ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে দিয়ে বা তার মুখ কাগজ বা কাপড় গুঁজে বন্ধ করে দিয়ে বিরোধীদলের এজেন্টদেরকে গায়ের জোরে তুলে দিয়ে ছাপ্পা দিয়ে থাকেন। বিধাননগরের মতো শিক্ষিত উচ্চবিত্তের এলাকাতেও এভাবেই পরলোকগত দ্বিজেনবাবুদের ভোট পড়ে যায়।
এখানে বলে রাখা দরকার কিছু মৃত্যু যে ‘এসআইআর’ এর কারণেই হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তা বলে ‘এসআইআর’ বন্ধ করে দেওয়ার কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ এটা হতে পারে না। বরঞ্চ যাদের ভোটার তালিকায় কোন কারণে নাম যদি না ওঠে তাহলে তারা যাতে আতঙ্কিত না হন, সে ব্যাপারে কেন্দ্র ও রাজ্য দুই শাসক দলেরই অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার দরকার ছিল। এমনকি নির্বাচন কমিশনেরও স্পষ্ট করে এটা বলা দরকার ছিল। কিন্তু সবপক্ষই করছেন ঠিক উল্টোটা। আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন এবং সেই আতঙ্কের আগুনে রাজনৈতিক রুটি সেঁকছেন। গোটা বাংলা জুড়ে তাই ভোটার তালিকায় নাম তোলার সাথে জড়িয়ে গেছে বে-নাগরিক হওয়ার আতঙ্ক। এমনকি নির্বাচন কমিশনকেও জনমানসে জাঁকিয়ে বসা আতঙ্ক দূর করতে কোন সদর্থক ভুমিকা নিতে দেখা যাচ্ছে না। উলটে নির্বাচন কমিশনের মত একটি স্বয়াত্তশাসিত সংস্থার আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ‘বিএলও’দের ফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। বলা হচ্ছে সময়মত কাজ শেষ না করতে পারলে থানায় এফআইআর করা হবে!
আর মনে রাখবেন আতঙ্কের বাতাবরণে সব থেকে বেশি বিক্রি হয় ‘আতঙ্ক’ই । আর সেটাই করছে বঙ্গ মিডিয়া। একবার ছুটছে স্বরুপনগরে অবৈধ অনুপ্রেশকারীদের বাইট নিতে যারা নাকি নিজেরাই নিজেদেরকে ‘এসআইআর’ আতঙ্কে ‘ডিটেক্ট-ডিটেইন্ড-ডিপোর্ট’ করতে হাজির হয়েছেন সীমান্তে! আবার পরক্ষনেই স্ক্রিন জুড়ে ভেসে উঠছে ব্রেকিং নিউজ…. অমুখ জেলায় এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যু হলো বা আত্মহত্যা করলেন জনৈক ভোটার, তমুখ জেলার বিএলও এসআইআর এর কাজ করতে গিয়ে চাপে ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়লেন অথবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন অথবা কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করলেন! এসবই সমানে চলছে নিউজ চ্যানেল গুলোতে। অবশ্য চলছে বললে কম বলা হয়। তারস্বরে-উচ্চগ্রামে চলছে বললে ঠিক বলা হয়। এমনকি একশ্রেনীর মিডিয়ার সাংবাদিকদের বিরদ্ধে ‘আপনি অনুপ্রবেশকারী, আপনি পালাচ্ছেন কেন , প্রমান দেখান আপনি নাগরিক, আপনি অবৈধ ভাবে এদেশের ভাত খাচ্ছেন …” ইত্যাদি বলতে বলতে কম লেখাপড়া জানা সংখ্যালঘু মানুষের ঘরে ঢুকে পড়া, তাদেরকে ধাওয়া করা ও হেনস্থা করবার অভিযোগও উঠছে।
আর এই হই-হট্টগোলের মধ্যেই আমাদের রাজ্যের শাসকদলের একদা ‘দু-নম্বর’ কাম ‘মহাসচিব’ কাম ‘শিক্ষামন্ত্রী’ চাকরি চুরির দায়ে তিনবছর জেলেখেটে বেরিয়ে সদর্পে নিজের বাড়ির সোফায় বসে মিডিয়ার বুম-ক্যামেরার সামনে জানিয়ে দিলেন ‘এখন রাজনীতিতে দুর্নীতিটা কোন ইস্যু নয়’…. মানে যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো এই যে ভোটার হওয়ার জন্য রাজ্য জুড়ে এত্ত হুড়োহুড়ি, সেই ভোটাররাই ভোটের দিন নির্দ্বিধায় চোর-চিটিংবাজদের ভোট দিয়ে জিতিয়ে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও জেতাবেন, অন্তত জয়ী নেতা -মন্ত্রীরা সেরকমই মনে করেন। মানে ঐ যে প্রতিবেদনের শুরুতে বলছিলাম ঠিক কি কারণে আপনি ‘অরাজনৈতিক’ চিন্তাভাবনা থেকে ভোটার তালিকায় নাম না তুলতেই পারেন, মাননীয় জেলখাটা দুকানকাটা রাজনীতিবদ তাতেই সিলমোহর দিলেন। এর থেকে আরও একটা কথা পরিষ্কার হয় যে একদা রাজনীতিতে দুর্নীতি একটা ইস্যু ছিল, সততার একটা দাম ছিল। তা না হলে কেউ ‘সততার প্রতীক’ প্ল্যাকার্ড আর হোর্ডিং লাগাতো নাকি ? অর্থাৎ বাংলার রাজনীতিতে এটা একটা গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন যেখানে চুরি-চিটিংবাজি- দুর্নীতি আর কোন ইস্যুই নয়। তাহলে কথা হচ্ছে এই পরিবর্তন কি চেয়েছিলেন আপনি যেখানে মানুষকে ঠিক ভোটের আগে আগে আতঙ্ক ছড়িয়ে কাগজ খুঁজতে পাঠিয়ে, ভোটার তালিকায় নাম তোলানোতে ব্যস্ত রেখে একে একে চোরছ্যাঁচড় নেতা মন্ত্রীদের জামিনে ছেড়ে দেওয়া হবে, অথচ তা নিয়ে ভোট বাজারে কোন পলিটিকাল ন্যারেটিভ থাকবে না! আচ্ছা, বলুন তো রাজ্য জুড়ে সীমাহীন দুর্নীতিতন্ত্র কায়েম হওয়ার পর আর ঠিক কতজন প্রথম সারির তৃণমূল নেতা-মন্ত্রী দুর্নীতির কারণে জেলে রইলো ? উত্তর হলো ‘শূন্য’। এ কেমন সরকার যারা ডিটেইন্ড চোর-চিটিংবাজদের ‘রিলিজ’ করে দেয় আর দেশবাসীকে ডিটেক্ট, ডিটেইন্ড অ্যান্ড ডিপোর্টের ভয় দেখায় ? আপনি কি এমন চৌকিদার চেয়েছিলেন যিনি সমাজবিরোধীদের সাথে ‘সেটিং’ করে তাদের ছেড়ে দেবে ? আপনি কি এমন সততার প্রতীক চেয়েছিলেন যার আমলে ‘দুর্নীতিটা কোন ইস্যু নয়’ হয়ে যায় ?
কাজেই প্রত্যেক বঙ্গবাসীকে আমাদের অনুরোধ এই যে এত্ত কাঠখর পুড়িয়ে দৌড়ঝাঁপ করে ভোটার তালিকায় নাম তুলছেন, দয়া করে তার প্রতি সুবিচার করবেন। ভোটের দিন চোর-চিটিংবাজ-লুম্পেন এবং তাদের সাথে হাত মিলিয়ে চলা চৌকিদারদের চিহ্নিত করুন, তারপর এদেরকে ঘৃণা ভরে টেনে নামান ক্ষমতার সিংহাসন থেকে বাস্তবের মাটিতে- Detect, Despise and Dethrone! খতম করুন এই দুর্নীতিতন্ত্র। ‘দুর্নীতিটা কোন ইস্যু নয়’ বলবার সাহস যেন এরা আর না পায়।
ধন্যবাদান্তে
রাইজ অফ ভয়েসেস




