ডিমকে ডিমের মত থাকতে দাও / Sunday Ho Ya Monday

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অভিধানে নতুন এক গণআন্দোলনের জন্ম হয়েছে। একসময় জুতো ছিল প্রতিবাদের প্রতীক, পরে কালো পতাকা। এখন সেই ঐতিহাসিক ধারাকে অতিক্রম করে আমরা পৌঁছে গেছি উন্নততর, প্রোটিনসমৃদ্ধ এক রাজনৈতিক অস্ত্রে, যার নাম ডিম।

রাজনীতির ভাষায় একে বলা যেতে পারে “ওভাল প্রজেক্টাইল মেলিওয়েপেন”।

দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের দিকে ডিম উড়ছে। জনতার একাংশ এদের কাউকে কাউকে নাগালে পেলেই যেন কৃষি ও পোলট্রি দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে নতুন ধরনের গণতান্ত্রিক মতামত প্রকাশের পথ আবিষ্কার করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভোটের আগে জনমত সমীক্ষা যতটা নির্ভরযোগ্য নয়, ডিমের গতিপথ তার চেয়ে বেশি স্পষ্ট বার্তা দেয়। তবে রাজ্যে এই মুহূর্তে যা অবস্থা, এই নিয়ে অচিরেই একটা মঞ্চ তৈরি হতেই পারে।

কিন্তু সমস্যাটা হল, ডিম শুধুই ডিম নয়।

রান্নাঘরে সে প্রোটিন, কিন্তু বাতাসে ভেসে গেলে সে প্রায় আইনি গণবিধ্বংসী অস্ত্র। সাধারণ মানুষ ভাবতে পারেন, “একটা ডিমই তো!” কিন্তু আইন সম্ভবত ভাবছে, “একটা ডিম আজ, কাল কে জানে, হবে অমলেট বিপ্লব!”

ফলে ডিম হাত থেকে ছাড়ার মুহূর্তেই নাগরিকটি যেন একযোগে কয়েকটি ভারতীয় ন্যায়বিধির ধারার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেন। ডিমটি যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তবুও অপরাধ, লক্ষ্যভেদ করলে আরও অপরাধ, গাড়িতে লাগলে সম্পত্তির ক্ষতি, পুলিশ ঘেরাটোপের ভেতর ঢুকলে রাষ্ট্রযন্ত্রের মর্যাদাহানি; আর যদি কারও গালে গিয়ে ফাটে, তবে তো ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক অধ্যায় একসঙ্গে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

এতদিন আমরা জানতাম ডিম থেকে মুরগি হয়। এখন জানা যাচ্ছে, ডিম থেকে মামলাও হয়।

তবে এই ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। যে ডিম বাজারে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ, সেই ডিমই এখন রাজনৈতিক সভায় বিনামূল্যে উড়ে বেড়াচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত, মুদ্রাস্ফীতির যুগেও প্রতিবাদীরা কীভাবে এত মূল্যবান সম্পদ নিক্ষেপ করতে পারছেন।

আরও বিস্ময়কর, ডিম নিক্ষেপকারীরা বোধহয় জানেন না যে তাঁরা আসলে দেশের পোলট্রি শিল্পকে অপমান করছেন। যে বস্তু দিয়ে কেক হয়, এগ বিরিয়ানি হয়, অমলেট হয়, মিড ডে মিল হয়, তাকে রাজনৈতিক ক্ষেপণাস্ত্রে পরিণত করা কি খাদ্যসম্পদের বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদেরও কিছু আত্মসমালোচনা করা উচিত। কোনো জননেতার প্রতি যদি বারবার ডিম উড়ে আসে, তাহলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, “আইন কী বলছে?” এর আগে হয়তো আরেকটি প্রশ্ন করা যায়, “মানুষ এত রেগে আছে কেন?”

গণতন্ত্রে জনগণ সাধারণত ভোট দেয়, স্মারকলিপি দেয়, স্লোগান দেয়। যখন তারা খাদ্যসামগ্রী ছুড়তে শুরু করে, তখন সেটা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, সেটা রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্টও বটে।

অবশ্য এর মানে এই নয় যে ডিম ছোড়া সমর্থনযোগ্য। আইন নিজের কাজ করবে। কিন্তু রাজনৈতিক শ্রেণিরও মনে রাখা দরকার, নাগরিকের হাতে ডিম পৌঁছানোর আগেই যদি তার কথা কানে পৌঁছাত, তাহলে হয়তো ডিমের এমন উড়ান দেখতে হতো না।

রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে সভা-সমাবেশে মঞ্চের সামনে মেটাল ডিটেক্টরের পাশাপাশি “এগ ডিটেক্টর” বসাতে হবে। নিরাপত্তাকর্মীদের নতুন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, কীভাবে উড়ন্ত ডিমের স্পিন, গতি ও সম্ভাব্য অবতরণস্থল বিশ্লেষণ করতে হয়।

রাজনীতির এই নতুন যুগে নাগরিকদের জন্য শেষ পরামর্শ একটাই, “ডিমকে ডিম থাকতে দিন”।

কারণ পাতে পড়লে সে পুষ্টি, আর বাতাসে উড়লে সে কখনো চার্জশিট, কখনো শিরোনাম, কখনো বা “জনরোষের ব্যালটপেপার” হয়ে ওঠে।

ধন্যবাদান্তে,
রাইজ অফ ভয়েসেস