বাংলার ভোটে কখনও কখনও দ্বিতীয় হওয়াটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ঘটনা / How Bengal Changes Power

ফলতার উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার পরে প্রথম নজরে যে ছবিটা চোখে পড়ে, তা খুব স্পষ্ট। বিজেপির বিপুল জয়। এক লক্ষেরও বেশি ভোটের ব্যবধান। তৃণমূলের অস্বস্তিকর পতন। কিন্তু এই ছবির ঠিক নীচে আর একটি স্তর আছে, যেটা সংখ্যার কোলাহলের মধ্যে চাপা পড়ে যেতে পারে। সেই স্তরে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা অন্যরকম – বিজেপি কত ভোটে জিতল, তার থেকেও বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন কি এই নয় যে, তৃণমূলের পরে মানুষ কার দিকে তাকাতে শুরু করল?
বাংলার রাজনীতিতে বহু সময় দ্বিতীয় স্থান শুধুমাত্র পরাজয়ের পরিসংখ্যান নয়, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক মানচিত্রের ইঙ্গিত। এই রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল খুব কম ক্ষেত্রেই সরাসরি ঘটেছে। তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হয়েছে “প্রধান বিরোধী শক্তি”-র সামাজিক স্বীকৃতি। এক সময় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বামেদের উত্থানও এমনভাবেই। বামফ্রন্ট প্রথম দিনেই ক্ষমতায় আসেনি; তার আগে বহু বছর ধরে তারা বাংলার মানুষের কাছে “মূল প্রতিপক্ষ” হয়ে উঠেছিল। আবার সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল নব্বইয়ের দশকের শেষ ও দু’হাজারের শুরুর বাংলায়। তখন তৃণমূল কংগ্রেসও প্রথমে ক্ষমতায় আসেনি; তারা প্রথমে কংগ্রেসকে সরিয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি হয়েছিল। বহু আসনে তারা জিতত না, কিন্তু দ্বিতীয় হত। ধীরে ধীরে মানুষের মনে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল – বামেদের বিরুদ্ধে সত্যিকারের লড়াইটা কংগ্রেস নয়, তৃণমূল লড়ছে। বাংলার রাজনীতিতে সেই পারসেপশন শিফট-ই শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসকে প্রান্তে ঠেলে দেয়।
সাম্প্রতিক অতীতে বিজেপির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা দেখা গিয়েছে। ২০১৪-র আগে বিজেপি বাংলায় ক্ষমতার দাবিদার ছিল না। কিন্তু তারা ধারাবাহিক ভাবে দ্বিতীয় হতে শুরু করতে শুরু করেছিল ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই। বহু আসনে হেরেও তারা রাজনৈতিক ভাবে জিতছিল। কারণ মানুষ বুঝতে শুরু করেছিল, এরা লড়াইয়ে আছে। বাংলার ভোটে এই মনস্তত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটার অনেক সময় মতাদর্শের থেকেও আগে খোঁজে – কে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে।
ফলতার ফল সেই কারণেই কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ এখানে সিপিআইএম জেতেনি, বরং বিপুল ব্যবধানে হেরেছে। কিন্তু বহু বছর পরে তারা আবার এমন এক জায়গায় পৌঁছল, যেখানে তৃণমূলবিরোধী ভোটের একটা অংশ তাদের দিকে ফিরল। এই ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করা যেমন ভুল, তেমনই গুরুত্বহীন ভাবাও ভুল। কারণ রাজনীতিতে অনেক সময় সংখ্যার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় ভোটের গতিপথ। দীর্ঘদিন বাংলায় একটা ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল – তৃণমূল দুর্বল হলে তার রাজনৈতিক লাভ শেষ পর্যন্ত বিজেপির ঘরেই জমা পড়ে। ফলতা অন্তত দেখাল, সমীকরণটা সব সময় এত সরল নয়।
এই জায়গায় একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলতা সিপিআইএমের শক্তি বৃদ্ধির যতটা গল্প, তার থেকেও বেশি তৃণমূলের সামাজিক ভিত্তির ফাটলের গল্প। অর্থাৎ, এটা নিছক “বামেদের উত্থান” নয়; বরং শাসকদলের উপর থেকে কিছু ভোটারের আস্থা সরে যাওয়ার ইঙ্গিত। সেই ভোটের সিংহভাগ অংশ বিজেপির দিকে গেছে, আর একাংশ এমন এক রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজেছে, যারা বিজেপির বিরোধিতা করবে কিন্তু তৃণমূলেরও বিকল্প হতে চাইবে। সিপিআইএম সেই ফাঁকটুকুতে সাময়িক ভাবে হলেও জায়গা করে নিতে পেরেছে।
এখানেই ফলতার ফল তৃণমূলের কাছে অস্বস্তিকর। কারণ এত দিন পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুরক্ষা ছিল এই বিশ্বাস – বিজেপির বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত বিরোধী ভোট এক জায়গাতেই ফিরবে, আর সেটা তৃণমূল। ফলতা সেই নিশ্চয়তার ভিতরে সামান্য হলেও ফাটল ধরিয়েছে। বিশেষত যদি দেখা যায়, সংখ্যালঘু ভোটের একটা অংশ, অথবা পুরনো বামমনস্ক ভোটারদের একটা অংশ, আবার তৃণমূলের বাইরে তাকাতে শুরু করছে, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
অবশ্যই এখান থেকে সরাসরি “বাম প্রত্যাবর্তন”-এর সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কারণ বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনও মূলত তৃণমূল বনাম বিজেপিকে ঘিরেই আবর্তিত। বিজেপির সাংগঠনিক বিস্তার, মেরুকরণের রাজনীতি এবং বিরোধী ভোটের বড় অংশের উপর তাদের দখল এখনও অটুট। সিপিআইএম এখনও সেই জায়গায় পৌঁছয়নি, যেখান থেকে তারা ক্ষমতার সরাসরি বিকল্প হতে পারে। কিন্তু রাজনীতির ইতিহাস বলে, প্রত্যাবর্তনের আগে সব সময় একটা ক্ষীণ ইঙ্গিত দেখা যায়। দ্বিতীয় স্থান বহু সময় সেই ইঙ্গিতের ভাষা।
বাংলার রাজনীতিতে কংগ্রেসকে সরিয়ে বামেরা উঠেছিল। পরে কংগ্রেসকে সরিয়েই তৃণমূল প্রধান বিরোধী শক্তি হয়েছিল। আবার বিজেপিও তৃণমূলের বিরুদ্ধে ওঠার আগে বহু বছর “দ্বিতীয় শক্তি” হিসেবেই জমি তৈরি করেছে। তাই ফলতার পরে প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে কে জিতল। বরং প্রশ্নটা আরও গভীর – বাংলার ভোটার কি আবার নতুন করে কোনও “দ্বিতীয় শক্তি”-র দিকে তাকাতে শুরু করেছেন?
কারণ এই রাজ্যে বহু সময় সবচেয়ে বিপজ্জনক ঘটনাটা ঘটে তখনই, যখন কোনও দল হঠাৎ জিতে যায় না – বরং মানুষ ধীরে ধীরে তাকে দ্বিতীয় স্থানে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
ধন্যবাদান্তে
রাইজ অফ ভয়েসেস



