সেটিং উন্মোচিত / The Setting Story

বহু ব্যবহৃত ‘সেটিং’ তত্ত্ব এখন আর গুজব নয়।
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এবার আর কানে কানে ফিসফাস নয়, চায়ের ঠেকে চোখ টিপে ইশারা নয়, তৃণমূল আর বিজেপির সেটিং এখন প্রকাশ্যে। জনমননে। সেটিং এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আর ঢাকারও প্রয়োজন বোধ করছে না কেউ। যেন দু’দলেরই আত্মবিশ্বাস, মানুষ সব দেখেও দেখবে না, বুঝেও বুঝবে না।

কিন্তু সমস্যা হল, মানুষ দেখছে। আর দেখলেই যা হয়, বিশ্বাস ভাঙে। বিশ্বাস ভাঙলেই যা হয়, সমর্থন হুড়মুড়িয়ে নামে।
এই বাংলায় বহুদিন ধরেই বামেদের তরফে বলা হচ্ছিল “সবটাই সেটিং”। একসময় সেটা শোনাত কনস্পিরেসি থিওরি, হালকা অতিরঞ্জন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভাষা। আজ আর তা নয়। আজ সেটিং তত্ত্ব নিজের প্রমাণ নিজেই হাজির করছে ঘটনার পর ঘটনা, নীরবতার পর নীরবতা, বিচারের নামে প্রহসন, নাটকের পর নাটক।
ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যে প্রশাসনিক সন্ত্রাস চলছে, তাতে কার লাভ হচ্ছে? বিজেপির? সরাসরি না। তৃণমূলের? সরাসরি না। তাহলে কার? ক্ষমতার স্থিতাবস্থার। দুই মেরুরই। বিজেপি ভয় দেখায়, তৃণমূল আশ্রয়ের ভান করে। ভয় আর আশ্বাস, এই দুইয়ের মাঝখানে সাধারণ মানুষ স্যান্ডউইচ হয়ে যায়।

ভিন রাজ্যে বাংলা বললে মার, গালিগালাজ, এমনকি মৃত্যু। কেন্দ্র চুপ। রাজ্য ক্ষোভ দেখায়, কিন্তু ফলশূন্য। এই নাটক কি অজান্তে? নাকি লিখিত স্ক্রিপ্ট? বিজেপি বাঙালিকে শত্রু বানিয়ে নিজের কোর ভোট ধরে রাখে, তৃণমূল সেই অপমানকে পুঁজি করে আবেগ জাগায়। দুই দিকেই লাভ। মৃতের পরিবার? ভোটার? তারা শুধুই পরিসংখ্যান।

আরজিকর, নিয়োগ দুর্নীতি, গরু পাচার প্রতিটা কেসেই তদন্ত সংস্থা ঢুকে পড়ে, তারপর বছর বছর ধরে কিছুই হয় না। অভিযুক্তরা জামিন পায়, মামলা হিমঘরে পাচার হয়ে যায়। জনগণ প্রশ্ন করে, এত বড় বড় অভিযোগ, অথচ কোনো পরিণতি নেই কেন? উত্তর আসে না। কারণ উত্তরটা অস্বস্তিকর, সেটিং থাকলে বিচার হয় না, কেবল তদন্ত চলতে থাকে।

ইডি–সিবিআই নাটকও তাই। হুঙ্কার আছে, গ্রেপ্তার নেই। হানা আছে, হাতকড়া নেই। দু’দলই জানে একটা সীমার বেশি গেলে বিপদ দু’দলেরই। তাই দড়ি টানা হয়, কিন্তু ছিঁড়তে দেওয়া হয় না। এটাও সেটিং।
কিন্তু এই খেলাটা দীর্ঘদিন চলে না। কারণ মানুষ বোকা নয়। মানুষ ধৈর্যশীল, কিন্তু অন্ধ নয়। একসময় সে বুঝতে শেখে এই দুই পক্ষের লড়াইটা আসলে লড়াই নয়, সমন্বয়। সমঝোতা।

আর ঠিক এখানেই শুরু হচ্ছে অন্য এক বাস্তবতা।
তৃণমূলের ভোট ক্ষয় হচ্ছে। বিজেপিরও হচ্ছে। কারণ দু’জনেরই মুখোশ এক। একজন শাসন করে, অন্যজন ভয় দেখায়। কিন্তু রুটি নেই, কাজ নেই, নিরাপত্তা নেই, ভোটাধিকার নেই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কারও কাছেই নেই।
এই শূন্যতাই রাজনীতির আসল জায়গা। আর সেই জায়গাটা ফাঁকা পড়ে থাকতে পারে না।
এখানেই বামেদের সম্ভাবনা।
বাম মানেই নিখুঁত এমন কোনো দাবী নেই। বামের ভুল আছে, ব্যর্থতা আছে, ইতিহাস আছে। কিন্তু একটা জিনিস বামের কাছে এখনও আছে, তাদের সাথে সেটিং নেই। কেন্দ্রের সঙ্গে নয়, কর্পোরেটের সঙ্গে নয়, তদন্ত সংস্থার সঙ্গে নয়, দুর্নীতির সাথে নয়। এই অনুপস্থিতিটাই আজ বামের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
মানুষ যখন দেখে দু’দিকেই একই খেলা, তখন সে তৃতীয় রাস্তা খোঁজে। সেই রাস্তা আবেগের নয়, যুক্তির। ভয়ের নয়, প্রশ্নের। আর সেইখানেই বাম আবার প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
তবে সুযোগ মানেই স্বয়ংক্রিয় লাভ নয়। সেটিং ভাঙতে হলে শুধু স্লোগান যথেষ্ট নয়। চাই স্পষ্ট অবস্থান, মাঠে থাকা, ভাষার সঙ্গে জীবনের মিল। মানুষ আর তত্ত্ব শুনতে চায় না, চায় সঙ্গী। আর সিপিআইএমের সাম্প্রতিক বাংলা বাঁচাও যাত্রা বামেদের সেই পথ প্রশস্ত করেছে।

তৃণমূল-বিজেপির সেটিং এখন আর গোপন নয়। প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তার শক্তি কমছে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে-সবচেয়ে বিপজ্জনক জোট সেইটাই, যেটা মানুষ বুঝে ফেলে।
এই বাংলায় এখন ঠিক সেই সময়।
সেটিং স্পষ্ট। অসন্তোষ গভীর।
আর সেই ফাঁকটাই – রাজনীতির আসল যুদ্ধক্ষেত্র। হয়তো এবার খেলা ভাঙার খেলা খেলতেই মানুষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেটা বোঝা যাবে আর কয়েকমাসেই।
ধন্যবাদান্তে,
রাইজ অফ ভয়েসেস




