বাজার কাদের? শহর কাদের? দেশটাই বা কাদের? / Development Against the Poor

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রেলস্টেশনে হকার উচ্ছেদের অভিযান চলছেই। এবার খবর আসছে, বহু রেলবাজার ও স্টেশন সংলগ্ন এলাকাতেও উচ্ছেদের নোটিশ পৌঁছতে শুরু করেছে। প্রশাসনের ভাষায় এগুলো “অবৈধ দখল”। কিন্তু রাষ্ট্রের অভিধানে যেটি “দখল”, বাস্তব জীবনে সেটিই বহু মানুষের একমাত্র জীবিকা।

একবার চোখ তুলে দেখুন সেই রেলবাজারগুলোর দিকে।
ভোর চারটেয় নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পূর্ব বর্ধমান কিংবা উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার গ্রাম থেকে ছোট চাষিরা সবজি, ফল, ফুল, ডিম, মাছ নিয়ে ট্রেনে চেপে শহরে আসেন। কেউ দুই বিঘে জমির মালিক, কেউ ভাগচাষি, কেউ বা ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক। সারা দিনের বিক্রির উপর নির্ভর করে সেদিনের সংসার চলবে কি না।
তাঁদের কেউ আদানি নন। কেউ আম্বানি নন। তাঁদের নামে শেয়ারবাজার ওঠানামা করে না। টেলিভিশনের স্টুডিওতে তাঁদের নিয়ে মিনিটখানেক আলোচনা হয় না। কিন্তু তাঁরাই শহরের মানুষের থালায় সবজি পৌঁছে দেন, রান্নাঘরে ডিম পৌঁছে দেন, অর্থনীতির সবচেয়ে মৌলিক চাকা ঘুরিয়ে রাখেন।
আজ সেই মানুষগুলোর হাত থেকে বাজার কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
প্রশ্ন হলো, তারপর কী?
রাষ্ট্র কি তাঁদের চাকরি দেবে? নতুন ব্যবসার মূলধন দেবে? পরিবারের খাবারের দায়িত্ব নেবে? সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করবে?
যদি না পারে, তাহলে কোন নৈতিক অধিকারে তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া হচ্ছে?
একটি সভ্য রাষ্ট্র কখনও দরিদ্র মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে না। কিন্তু আজ যেন উল্টো ছবিই দেখা যাচ্ছে। কোটি কোটি টাকার কর্পোরেট প্রকল্পের জন্য জমি, কর ছাড়, অবকাঠামো, সরকারি সহায়তা, সবকিছু সহজলভ্য। অথচ কয়েক ফুট জায়গায় বসে সবজি বিক্রি করা মানুষটিকে উচ্ছেদ করার জন্য রাষ্ট্রের অদম্য উৎসাহ।

এ কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, এটি এক ধরনের শ্রেণিগত ঔদ্ধত্য।
যারা নীতি নির্ধারণ করেন, তাঁদের অনেকেই হয়তো কখনও ভোরবেলার লোকাল ট্রেনে চাষিদের ভিড় দেখেননি। দেখেননি কীভাবে একজন বৃদ্ধ কৃষক মাথায় ঝুড়ি নিয়ে শহরে এসে সারাদিন বসে থেকে কয়েকশো টাকা লাভ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। সেই কয়েকশো টাকাই তাঁর সন্তানের স্কুলের খাতা, বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ, কিংবা রাতের ভাতের ব্যবস্থা করে।
রাষ্ট্র যদি সেই মানুষগুলোর জীবনকে কেবল “এনক্রোচমেন্ট” বা “অবৈধ দখল” বলে দেখতে শুরু করে, তাহলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের সামাজিক ভিত্তিকেই ধ্বংস করে।
ইতিহাসের একটি নির্মম শিক্ষা আছে। মানুষ অনেক কিছু সহ্য করতে পারে। অপমান সহ্য করতে পারে, বঞ্চনা সহ্য করতে পারে, কষ্ট সহ্য করতে পারে। কিন্তু যখন মানুষের মুখের খাবার কেড়ে নেওয়া হয়, যখন তার সন্তানকে খাওয়ানোর ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়, তখন সমাজে ক্ষোভ জমতে থাকে। সেই ক্ষোভ একদিন বিস্ফোরিত হয়।
যাদের খেতে দিতে পারবেন না, তাদের মুখের খাবার কেড়ে নেওয়ার রাজনীতি কখনও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ইতিহাসে তার পরিণতি কখনও শুভ হয়নি।
ফুটপাত, বাজার, স্টেশন চত্বর, এসব কেবল ইট-পাথর বা সরকারি সম্পত্তি নয়। এগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষের শ্রম, ঘাম ও বেঁচে থাকার অধিকারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। শহরকে সুন্দর করতে হবে, অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু মানুষের জীবন ধ্বংস করে নয়।
দেশটা শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠীর নয়। দেশটা শুধু কর্পোরেট ব্যালান্সশিটের নয়। দেশটা সেই চাষিরও, যে ভোরে মাঠে নামে। সেই হকারেরও, যে সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই শ্রমিকেরও, যে নিজের শ্রমে অর্থনীতিকে সচল রাখে।
গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রথম কর্তব্য মানুষের জীবিকা রক্ষা করা। যদি রাষ্ট্র সেই কর্তব্য ভুলে যায়, তাহলে উন্নয়নের নামে যা বাকি থাকে, তা কেবল শক্তির প্রদর্শন, ন্যায়বিচার নয়।
ধন্যবাদান্তে,
রাইজ অফ ভয়েসেস



