বিজেপি কেন বিশ্বাস হারাল? / BJP’s Credibility Crisis

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংকট কোনও একক দলের নয়, বরং বিরোধী রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতার। কাগজে-কলমে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল এখনও ভারতীয় জনতা পার্টি। কিন্তু রাজনীতি শুধু বিধানসভায় আসনের হিসেব নয়। রাজনীতি হল মাঠে থাকা, ধারাবাহিক চাপ তৈরি করা এবং সর্বোপরি – মানুষকে বিশ্বাস করানো যে একটি বিকল্প সত্যিই আছে। সেই পরীক্ষাতেই বিজেপি আজ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ৩ থেকে ৭৭টি আসন জিতে যে জায়গায় পৌঁছেছিল, তাকে নিঃসন্দেহে রাজ্য রাজনীতির এক বড় ঘটনা বলা হয়েছিল। সেই ফলাফলের পর থেকেই একটি বয়ান তৈরি হয়, বাংলায় নাকি স্থায়ী দ্বিমেরু রাজনীতি, শাসক আসনে তৃণমূল, বিরোধী আসনে বিজেপি। কিন্তু রাজনীতিতে বয়ান টেকে বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে। আর বাস্তবতা বলছে, বিজেপির সেই ভিত্তি ক্রমশ আলগা হয়ে যাচ্ছে।
সংখ্যা দিয়েই শুরু করা যাক। ৭৭ জন বিধায়কের মধ্যে ইতিমধ্যেই ১২ জন দল ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস-এ যোগ দিয়েছেন। বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা নেমে এসেছে ৬৫-তে। যদিও মুকুল রায়ের মত অনেকেই কাগজে কলমে বিজেপি বিধায়ক হলেও, সসম্মানে ফিরে এসেছেন তাদের পুরোনো দল তৃনমূল কংগ্রেসে। এই পতন কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক মহলে এখন আর তা গোপন কথা নয় যে বিজেপির বিধায়ক শিবিরে আরও অনেকেই তৃণমূলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে আছেন। কেউ প্রকাশ্যে বলছেন না, কিন্তু নীরবতা, বৈঠক, যোগাযোগ, মন্দির উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সস্ত্রীক সাক্ষাৎ, সব মিলিয়ে ইঙ্গিত স্পষ্ট। অর্থাৎ, ৭৭ থেকে ৬৫-তে নামা শেষ অধ্যায় নয়, বরং একটি ধারাবাহিক ভাঙনের মধ্যবর্তী অধ্যায়।
এই ভাঙনের কারণ আদর্শগত তর্কে খুঁজলে ভুল হবে। বিজেপির সমস্যা আজ মূলত রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার। ২০২১-এর পর যেভাবে তৃণমূল থেকে আসা নেতারা বিজেপিতে ঢুকে রাতারাতি গুরুত্বপূর্ণ উচু পদ দখল করেছেন, তাতে দলের পুরনো কর্মীরা যেমন হতাশ, তেমনই সাধারণ ভোটারের মনেও প্রশ্ন জেগেছে, এই দল কি সত্যিই বিকল্প, নাকি ক্ষমতার রাজনীতির আরেক সংস্করণ? ‘সেটিং’-এর এই রাজনীতি বিজেপির সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে।
এক সময় বিজেপি নিজেকে দুর্নীতিবিরোধী শক্তি হিসেবে দাবি করেছিল। আজ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা কাল পর্যন্ত বিজেপির চোখে ‘চোর’ ছিলেন, দলে ঢোকার পর তাঁরাই ‘ধোয়া তুলসী পাতা’। এই দ্বিচারিতাই বিজেপির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ভিতর থেকে ক্ষয় করেছে। রাজনীতিতে মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ধারাবাহিক দ্বিচারিতা মানুষ ক্ষমা করে না।
এই বিশ্বাসঘাটতির প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট মাঠের রাজনীতিতে। রাজনীতির একটি প্রাথমিক সত্য, যে দল রাস্তায় নেই, সে দল মানুষের মনে নেই। শাসক দল হয়েও তৃণমূল রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন নামে র্যালি, জনসংযোগ কর্মসূচি ও রাজনৈতিক মিছিল করেছে। সেই কর্মসূচির মূল্যায়ন আলাদা বিষয়, কিন্তু তারা মাঠে আছে। অন্যদিকে সিপিআই(এম) রাজ্যজুড়ে ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ করে শিল্পহীনতা, কর্মসংস্থান সংকট, গণতান্ত্রিক অধিকার ও কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্কের প্রশ্নে সংগঠিত রাজনৈতিক উপস্থিতি তৈরি করেছে। তাই বিরোধী রাজনীতির শূন্যতা পূরণ করতে অন্য শক্তিগুলি মাঠে নামছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিজেপির অনুপস্থিতি আরও চোখে পড়ে। রাজ্যজুড়ে কোনও ধারাবাহিক যাত্রা নেই, কোনও নির্দিষ্ট সামাজিক–অর্থনৈতিক দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন নেই। বিজেপির রাজনীতি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বড় সভা, টিভি বিতর্ক, কতিপয় কিছু ইউটিউব চ্যানেল এবং দিল্লির নেতৃত্বের এক্স হ্যান্ডেলের বক্তব্যে। রাজ্য রাজনীতিতে এই অনুপস্থিতির ফল ভয়াবহ। বিরোধী চাপ তৈরি হয় না, আর সেই শূন্যতা অন্যরা পূরণ করে।
এই বৈপরীত্য সবচেয়ে নগ্নভাবে ধরা পড়েছে ব্যারাকপুরে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভা থেকে। কয়েকদিন আগে অমিত শাহ একবারে হুঙ্কার দিয়েছেন, তৃণমূলের দুর্নীতিগ্রস্তদের ‘জেলে ঢোকানো হবে’। কথাটি শুনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে – জেলে ঢোকাতে আপত্তিটা কোথায়? কেন্দ্রে তো বিজেপি ক্ষমতায়। সিবিআই, ইডি, এনআইএ, কেন্দ্রীয় বাহিনী – সবই তো দিল্লির হাতে। তাহলে আজও কেন বাংলার দুর্নীতির অভিযুক্তরা প্রকাশ্য রাস্তায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর কোথাও পাওয়া যায় না। কারণ উত্তরটা অস্বস্তিকর। সত্যি বলতে কী, ‘জেলে ঢোকাব’ না বলে যদি অমিত শাহ বলতেন, “এক এক করে তৃণমূলের সব দুর্নীতিগ্রস্তকে দলে ঢুকিয়ে উচু পদ দেবো”, তাহলে সেটাই আম বাঙালির কাছে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হত। কারণ বাস্তব ইতিহাস ঠিক সেটাই দেখিয়েছে।
ব্যারাকপুরে হুঙ্কারের ঠিক পরের দিনই কেন্দ্রীয় বাজেটে ফের বাংলার জন্য বরাদ্দ প্রায় শূন্য। কিন্তু সমস্যা শুধু টাকার নয়। বিজেপি শুধু বাজেটেই বাংলাকে বঞ্চিত করেনি, বঞ্চিত করেছে সংবিধানস্বীকৃত ন্যায়বিচারের অধিকার থেকেও। তা না হলে আরজি কর হাসপাতাল কাণ্ড, বগটুই গণহত্যা, চাকরি চুরি, রেশন চুরি, কয়লা চুরি, গরু চুরি, ফাইল চুরি এই সব কাণ্ডের আসল মাথারা আজও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াত না।
ঘটনাচক্রে এরা সবাই আবার একই বৃহত্তর গ্যাং-এর অংশ। তাহলে একটা গ্যাং ধরতে পারলেই তো ল্যাটা চুকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ও তাদের তদন্তকারী এজেন্সিগুলো বাংলার মানুষের মুখ চেয়ে সেটুকুও করেনি। কারণ এখানে তদন্ত উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য দর কষাকষি।
বাংলায় বিজেপির বর্তমান ও অদূর অতীত ঘাঁটলেই দেখা যাবে মুকুল, শুভেন্দু, শোভন, শঙ্কু, তাপস, অর্জুন একগাদা দুর্নীতিগ্রস্ত ‘প্রাক্তন’ তৃণমূল নেতা আজ গেরুয়া শিবিরে নিরাপদ। যে মানুষগুলো কাল পর্যন্ত ‘চোর’ ছিল, দলে ঢোকার পর তারা ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ হয়ে যায়। এটাই বিজেপির প্রকৃত ওয়াশিং মেশিন রাজনীতি।
এই দ্বিচারিতার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিজেপির বিধায়কদের মনস্তত্ত্বে। একজন বিধায়ক শুধু আইনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার মানুষ নন; তিনি নিজের এলাকার প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। বিজেপির বহু বিধায়ক আজ বুঝতে পারছেন, এই দলে থেকে এলাকায় কাজ করানো কঠিন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, আর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ক্রমশ কমছে। তার ওপরে আরএসএস মুখপাত্র স্বস্তিকা তাদের এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি লিখেছে, “এটা ঠিক অনেকের কাছে মূল সমস্যা, অভিষেক কেন জেলের বাইরে? এটা অবান্তর চিন্তা। তদন্তকারীদের মতে গ্রেফতার তদন্তের একটি অংশ। পুরো তদন্ত নয়। মনে হয় এই একমুখী ভাবনা এখানকার বিরোধীদের সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে।” যা বঙ্গ বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থানের সম্পুর্ন বিরোধী। এই বাস্তবতা থেকেই আরও দলত্যাগের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আর তা কেবল নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বহু কর্মী সমর্থক একরাশ বিরক্তি নিয়ে রাজ্যের নানা প্রান্তে দল ছাড়ছেন। আর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়েছে এসআইআরে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নামক নাগরিক হয়রানি।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘প্রধান বিরোধী দল’ ধারণাটাই আজ নতুন করে বিচার্য। প্রধান বিরোধী হওয়া মানে শুধু সংখ্যায় দ্বিতীয় হওয়া নয়। তার মানে বিকল্প নীতি, ধারাবাহিক আন্দোলন এবং শাসকের উপর বাস্তব চাপ তৈরি করা। এই তিনটি ক্ষেত্রেই বিজেপি আজ পিছিয়ে। তাই ব্যারাকপুরের সভার মত ‘জেলে ঢোকাব’ বলে ভবিষ্যতে আর লোক হাসিয়ে লাভ নেই। বাংলা এখন স্লোগান নয় – বিচার চায়।







