রবি দাস / The Proletariat

মাসখানেক আগে অনির্বাণের হুলিগানইজমের গানের “সিপিএম কেন শুন্য?” লাইন নিয়ে সমাজমধ্যমে হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল। গান, পাল্টা গান, যুক্তি, অযুক্তি, বিশ্লেষণ, অতিবিশ্লেষণে রামরম করছিল নেটপাড়া। আর আজ, এই নিয়ে কনামাত্র আলোচনা নেই। কিন্তু “সিপিএম কেন শুন্য” সেই কারণ একটি গানের একটি লাইনে লুকিয়ে নেই, সেই কারন অনেক গভীরে।
কোনো এক রবিবার সকাল। কলকাতার রাস্তায় তখনো রোদ পুরোপুরি ওঠেনি, কিন্তু সিপিএমের মিছিলের ভিড় ততক্ষণে জমে গেছে। লাল পতাকা দুলছে, স্লোগান ওঠছে, লাইভ রেকর্ডিং চলছে, কোথাও কোথাও নতুন প্রজন্ম ছবি তুলছে। সেই ভিড়ের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসছে একটা পুরনো লোহার ট্রাইসাইকেল। তার চালক এক মধ্যবয়স্ক মানুষ; গায়ে লাল জামা, গলায় পুরনো গামছা, চেহারায় ক্লান্তি-মিশ্রিত দৃঢ়তা। তাঁর দু’চোখে যেন এক ধরনের নীরব, উচ্চারণহীন শপথ। এই মানুষটির নাম কমরেড রবি দাস।

রবি দাস কোনও বিখ্যাত নেতা নন, কোনও সেলিব্রিটি নন, কোনও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট নন। তিনি বক্তা নন, লেখক নন, প্যানেল বিশ্লেষক নন, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর নন। তিনি বাম রাজনীতির মধ্যবিত্ত তাত্ত্বিক নন, কোনও কমিটি–মিটিং–নোটস–রেজলিউশনের মুখ নন। রবি দাস হলো সেই মানুষটি, যাঁকে একদিন দেখেছিলাম ব্রিগেডের খোলা মাঠে শীতের রাতে চাদর মুড়ে চুপচাপ শুয়ে থাকতে। কাউকে কিছু বলেননি। কোনও “থাকার ব্যবস্থা” চাননি। শুধু ব্রিগেডের খোলা ময়দানে নিজের মতো করে, নিজের বিশ্বাসটুকু আঁকড়ে রেখেছিলেন। সিপিএম যেখানে–সেখানে রবি দাস। মিছিলে থাকবেন, ধর্নায় থাকবেন, যাত্রায় থাকবেন, প্রতিবাদে থাকবেন। এমনকি মুখ্যমন্ত্রীত্ব হারানোর পর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন; তখনও রবি দাস ছিলেন—নিঃশব্দে, নির্লোভে, হাসপাতালের বাইরে বসে।
আপনি বাম রাজনীতিকে যাই বলুন—ভ্রান্ত, শক্তিহীন, দিশেহারা—কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, রবি দাসদের মতো মানুষদের উপর দাঁড়িয়েই সিপিএম বেঁচে থাকে। এবং আজও বেঁচে আছে। এরা হাজারেও নয়—লক্ষও নয়। এরা “ভোটব্যাঙ্ক” নয়। তবু এদের প্রত্যেকে এক একটি স্তম্ভ। এক একটি শক্তি। এক একটি মানবিক আগুন, যা রাজনীতির কংক্রিটের ভিতর থেকে উষ্ণতা বের করে আনে।

কিন্তু ঠিক এখানেই দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা ফেরত আসে—
তাহলে সিপিএম শূন্য কেন?
কারণ রবি দাসের মতো মানুষরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু দল তাদের লড়াইকে কেন্দ্র করে রাজনীতি চালাতে অনেকটা সংযমী হয়ে পড়েছে। যারা মাঠে আছে, তাদের চেয়ে দল বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছে রুটিন কর্মসূচিকে। নিজেকে বেঁধে ফেলেছে এমন এক শ্রেণির মধ্যে যারা রাজনীতিকে ভোগ্যপণ্য মনে করে – তারা মধ্যবিত্ত।
এক সময় মধ্যবিত্ত বাম ভোটার দলের মস্তিষ্ক ছিল, কিন্তু আজ মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ দলের ফাঁপা আত্মবিশ্বাসের নার্ভ সেন্টার। তারা রাজনীতি দেখে টিভির পর্দায়, মিমের ভেতরে, ফেসবুক গ্রুপে, হোয়াটসঅ্যাপ বিতর্কে। সেখানে সবই আছে – ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ, শ্রেণি সংগ্রাম, রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি, মার্ক্সের থিওরি, জ্ঞানী বাম ভঙ্গি – কিন্তু নেই মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ।
মধ্যবিত্ত বামদের কাছে রাজনীতি আজ একটি “নৈতিকতার খেলা”- যেখানে তারা আপন বাড়ির নিরাপত্তায় বসে তত্ত্ব ছোঁড়ে, এনালাইসিস লেখে, ওপিনিওন দেয়। কিন্তু রবি দাসের মতো মানুষের কাছে রাজনীতি – শ্বাস নেওয়ার মতো সহজ এবং দায়বদ্ধ। তার কাছে রাজনীতি কোনও পাওয়া না পাওয়া নয়, কোনও পোস্ট নয় – সেটা জীবনের ভরসা।

সিপিএমের এই দুই শ্রেণির মধ্যে দূরত্ব আজ রাজনৈতিক খাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিপিএমের শূন্যতার আসল কারণ এখানেই। দল রবি দাসদের থেকে দূরে গিয়েছে। আর মধ্যবিত্ত তত্ত্বাবধায়কদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যবিত্ত আজ আর trend-setter নয়। তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত; ভোটের দিন এদের বড় অংশ বাড়িতে থাকে বা বাইরে বেড়াতে চলে যায়। তারা বুথ বাঁচাতে আসে না, ছাপ্পা আটকাতে নামে না। দিনের শেষে তারা দর্শক এবং নিরাশাবাদের প্রচার করে। আর সিপিএম তাদেরকেই প্রথম শ্রোতা করে ফেলেছে – এই ভুল, রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
রবি দাসদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, দল কোথায় কোথায় ভেঙে পড়েছে। তিনি দিন আনে দিন খায়, তাঁর ট্রাইসাইকেলই তাঁর শক্তি। তবু তাঁকে রাজনীতি শেখাতে হয় না, তাঁকে কোনও বুদ্ধিজীবী বোঝাতে হয় না “এজেন্ডা কী হওয়া উচিত”।তিনি জানেন, তাঁর জায়গা ঠায় মাঠে, ঠায় মানুষের পাশে। তাঁর কাছে রাজনীতি কোনও ফলনের হিসেব নয়, কোনও পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যায় নয় – এটা বেঁচে থাকার, বিশ্বাস করে থাকার, পাশে দাঁড়ানোর এবং পতাকা না ফেলে দেওয়ার লড়াই।

সিপিএমের সমস্যা হলো, দল নিজেকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করেনি যাতে রবি দাসদের মতো লাখো মুখ – যারা নীরবভাবে বিপ্লব বহন করে – তাদের শক্তিকে সংগঠিত করা যায়। বরং দল বারবার ফোকাস সরিয়ে নিয়ে গেছে শহুরে “নেতা-হতে-চাওয়া” মধ্যবিত্তদের দিকে – যারা অনলাইনে তর্কে জিতে খুশি হয়, কিন্তু বাস্তবে মাঠে নামতে রাজি নয়। এরা “রবীন্দ্রনাথ” নিয়ে আলোচনা করে, কিন্তু ওয়ার্ডের ড্রেন, রাস্তা, পানীয় জল, রেশন কার্ড, লিস্ট সংশোধন – এই বাস্তবগুলো ছুঁতে চায় না। আর ঠিক এগুলোই ভোট এনে দেয়। এগুলোই রাজনৈতিক লয়ালিটি তৈরি করে। এগুলোই শাসক দলের নেটওয়ার্ক বানায়। সিপিএম এগুলো ভুলেছে। আর সেই ভুলের মাশুল শূন্য।
রবি দাস-এর মতো মানুষেরাই সিপিএমের অক্সিজেন। কিন্তু অক্সিজেনের উৎস ভুলে গেলে শরীর বাঁচে না।
সিপিএম শূন্য হয়ে যাওয়ার আরেকটি গভীর কারণ দলের reactive politics। দল প্রতিপক্ষ কি বলছে, সেটা শুনে তার প্রতিক্রিয়া দেয়; নিজের অ্যাজেন্ডা বানায় না। বিজেপি বা তৃণমূল বলল – আর সিপিএম তার জবাব দেওয়া শুরু করল। কিন্তু রবি দাসদের রাজনীতির ভাষা প্রতিক্রিয়া নয় – আস্তিত্ব। তারা প্রশ্নের জবাব দেয় না, তারা উপস্থিতির ভিত তৈরি করে।
তারা মিছিলের ভিড় দেখে আসে না – মিছিল তাদের দেখে।
গ্রাউন্ড লেভেলের যে কাজগুলো রাজনৈতিক আত্মা তৈরি করে – যেমন প্রতিদিন দোকানদারকে কমরেড বলে ডাকতে শেখানো, রিকশাওয়ালার সঙ্গে কথা বলা, বাড়ির গলিতে খোঁজ নেওয়া, সাম্প্রতিক SIR ফর্ম পূরণ করতে সাহায্য করা, হাসপাতালের লাইন ভাঙিয়ে দেওয়া – এই কাজগুলোকে আজ অনেক সিপিএম সমর্থক “ছোট কাজ” বলে অবজ্ঞা করেন। কিন্তু রাজনৈতিক সত্য হলো – এই ছোট কাজগুলোই ভবিষ্যতের বড় সংগঠন বানায়।

রবি দাসের ট্রাইসাইকেল এটাই শেখায় – রাজনীতি প্রতিদিনের উপস্থিতি ছাড়া হয় না। পতাকা হাতে স্লোগান দিয়ে, লাল জামা পরে মিছিল করে, বক্তৃতা শুনে – সবই হয়, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন সমস্যায় পাশে না থাকলে রাজনীতি থাকে না।
সিপিএমের নিজের মানুষ এটা ভুলেছে। আর রবি দাস সেটা ভোলেননি। এটাই পার্থক্য।
সিপিএমের ভেতরের মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব আজও ভাবে – মিডিয়ায় কয়েকটা জায়গা পেলে, দু’চারজন বুদ্ধিজীবী সমর্থন জানালে, কয়েকটা “চমৎকার” ব্যানার করলে, কয়েকটা ভাইরাল পোস্ট দিলে দল উঠে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তব অন্য। মিডিয়া হলো মধ্যবিত্তের আফিম – যার কোনও প্রভাব রেশন লাইনের মানুষের সিদ্ধান্তে নেই। বাংলার শ্রমজীবী মানুষের ভোট নির্ধারিত হয় এমন লোকদের দ্বারা – যারা রবি দাসকে চেনে। রবি দাসকে দেখে। রবি দাসের ভরসায় থাকে।
আজকের সিপিএম যদি পুনরুজ্জীবিত হতে চায়, একটাই পথ আছে – রবি দাসের মতো মানুষের ওপর ভরসা ফিরে পাওয়া। তাদের চারপাশে রাজনীতি নির্মাণ করা। মধ্যবিত্তের তত্ত্ব, কাগুজে এনালাইসিস বা সোশ্যাল মিডিয়ার কথার ভিড় থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের জীবন ছুঁতে শেখা।
যেদিন সিপিএম আবার বুঝবে,
রবি দাস মানে সিপিএমের মেরুদণ্ড,
রবি দাস মানে লাল পতাকার প্রাণ।
রবি দাস মানে “আমি করব, কেউ না করলেও করব” – সেদিন সিপিএম আর শূন্য থাকবে না।
কিন্তু আজকের দিনে, যতদিন না সিপিএম তার নিজস্ব রবি দাসদের কেন্দ্র করে সংগঠন রিবিল্ট করছে,
ততদিন দল ভোটে শূন্য না হলেও, রাজনীতির আত্মায় শূন্যই থাকবে।
রবি দাস ট্রাইসাইকেল চালাতে চালাতে মিছিলের ভিড়ে মিলিয়ে যায়। কেউ তার নাম জানে না। কেউ তার সংগ্রামের ইতিহাস লেখে না। কিন্তু বাংলার বাম রাজনীতির প্রতিটা ইট, প্রতিটা স্মৃতি, প্রতিটা রক্ত, প্রতিটা বিপ্লব – তাঁর মতো মানুষের কাঁধেই বাঁধা।
সিপিএমের এই পাগল মানুষগুলো – এরা কোনও দলীয় কর্মী নয়, এরা ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহনকারী।
এদের কাছে রাজনীতি ক্ষমতা নয় – ভক্তি। এদের কাছে সিপিএম কোনও দল নয়, সিপিএম নিষ্ঠা।

এমন মানুষ থাকলে কোনও দল দুর্বল হতে পারে, কিন্তু মরে না।
তাই প্রশ্নটা আজ নতুন করে দাঁড়ায়, সিপিএম কি শূন্য?
না। সিপিএম শূন্য নয় – সিপিএম তার নিজের রবি দাসদের ভুলে গিয়েছিল বলে শূন্য দেখাচ্ছে।
যেদিন সেই ভুল স্বীকার করে ফের মাঠে নামবে – রবি দাসদের মতো মানুষ তখনও ট্রাইসাইকেল চালিয়ে মিছিলে আসবেন এবং রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলবেন – “আমি সিপিএম।”
সেই দিনই শূন্যতা ভাঙবে। ভাঙবেই ভাঙবে।





Anirban Chakraborty
Being a long-time reader, I must admit this particular writing is one of your best. The way the entire scenario has been presented has touched my heart, and it is factual, also. People (those who are aligned with the Left ideology) should introspect and discuss among ourselves where we have gone wrong. I am leaving aside the cash-flow factor and other benefits that flow in huge numbers during or before the election by the right-wing political parties. There has to be a disconnect between people and the party, and it’s the party’s responsibility to set things in order.
I must congratulate you and all the people who are behind this Rise of Voices platform. You are doing a really good job of enlightening our minds/knowledge.
Amitava Bhattacharya
লেখাটি অত্যন্ত মূল্যবান বার্তা বহন করছে। খুব ভালো লাগলো। ✊🏼✊🏼
Ramapada Chanda
অসাধারণ বিশ্লেষণ। খুবই বাস্তবসম্মত যুক্তিগ্রাহ্য সুন্দর লেখা। লেখাটা পড়ে মনটা ছুঁয়ে গেল,মনটা নাড়া দিয়ে গেল। সিপিএম কেন শুন্য, তার বেশ কয়েকটি কারণ আছে বৈকি , তবে শুন্য হবার যে মূল কারণ রবি দাসের মত মানুষদের থেকে পার্টির দূরত্ব বেড়ে যাওয়া এই বিষয়টি বাস্তব এবং অনস্বীকার্য। আশাকরি টিম আর ও ভির এই মূল্যবান প্রতিবেদন সি পি এম তথা বামপন্থী দলগুলোকে আগামীতে তাদের চলার পথের দিশা স্মরণ করিয়ে দিতে সাহায্য করবে।
Anshu dev Adhikari
প্রত্যেক বুথে বুথে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। এইসব খেটে খাওয়া মানুষদের সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় ভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সমর্থকদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরী করতে হবে। ভোটের সময় শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
Rahul Sengupta
অনির্বচনীয় অনিন্দ্যসুন্দর গভীর মনোজ্ঞ।
কুর্ণিশ!!!